ফিচার বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সর্বশেষ নারী

আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে জাতিসংঘ মহাসচিবের বাণী

আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে জাতিসংঘ মহাসচিবের বাণী

শান্তি ও নিরাপত্তা, মানবাধিকার এবং টেকসই উন্নয়নে বৈশ্বিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে অপরিহার্য বিষয় হলো লিঙ্গসমতা ও নারীর অধিকার। আমরা কেবল ঐতিহাসিক অবিচার সমূহকে চ্যালেঞ্জ করে এবং সবার অধিকার ও মর্যাদার পক্ষে কথা বলে প্রতিষ্ঠানে আস্থা পুনঃস্থাপন ও সংহতি পুনর্গঠন করতে পারি এবং বহুমাত্রিকভাবে লাভবান হতে পারি।

সাম্প্রতিক দশকগুলোয় কিছু ক্ষেত্রে নারীর অধিকার ও নেতৃত্ব প্রশ্নে আমরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লক্ষ্য করেছি। কিন্তু এসব অর্জন পুরো বা ধারাবাহিক অর্জনের তুলনায় নগন্য এবং এগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে এরই মধ্যে পুরুষশাসিত সমাজব্যবস্থা থেকে সমস্যাপূর্ণ নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া এসেছে।

ক্ষমতার প্রশ্নে লিঙ্গসমতা একটি অপরিহার্য বিষয়। আমরা পুরুষশাসিত বিশ্বে পুরুষনিয়ন্ত্রিত সংস্কৃতির মধ্যে বাস করি। নারীর অধিকারকে আমরা যখন সবার লক্ষ্য হিসেবে নিই, যা কি না সবাইকে লাভবান করতে পারে এমন একটি পথ, তখনই কেবল আমরা ভারসাম্যে পরিবর্তন দেখি।

নারীদের মধ্যে থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীর সংখ্যা বাড়ানো অপরিহার্য। জাতিসংঘে আমি এই বিষয়টিকে ব্যক্তিগত ও জরুরি অগ্রাধিকার হিসেবে নিয়েছি। বিশ্বজুড়ে আমাদের দলগুলোকে নেতৃত্ব দানকারীদের মধ্যে এখন লিঙ্গসমতা নিশ্চিত হয়েছে এবং জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপনা দলে এখন নারী সদস্যের সংখ্যা আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি। আমরা এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি অব্যাহত রাখব।

কিন্তু ক্ষমতা প্রাপ্তি ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে নারীদের এখনো বড় ধরনের বাধার মুখোমুখি হতে হয়। বিশ্ব ব্যাংকের তথ্যানুসারে, মাত্র ছয়টি দেশ কর্মক্ষেত্রে নারী ও পুরুষকে সমানাধিকার দেয়। এবং এই ধারা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে অর্থনৈতিকখাতে লিঙ্গ পার্থক্য ঘুঁচিয়ে উঠতে এ বিশ্বের ১৭০ বছর সময় লাগবে।

জাতিয়তাবাদী, জনরঞ্জনবাদী ও কঠোরতা নীতিতে লিঙ্গ অসমতা যোগ করে, যা নারীর অধিকার খর্ব করে এবং সামাজিক পরিসেবা সীমিত করে। কিছু দেশে হত্যাকাণ্ডের সার্বিক হার কমলেও লিঙ্গজনিত কারণে বিদ্বেষপ্রসূত নারী হত্যার হার বাড়ছে। অন্য দেশগুলোর ক্ষেত্রে আমরা পারিবারিক সহিংসতার বা নারীর জননাঙ্গ ছেদের বিরুদ্ধে আইনি সুরক্ষার ঘাটতি দেখতে পাই। আমরা জানি, নারীর অংশগ্রহণ শান্তিচুক্তিকে টেকসই করে, কিন্তু এমনকি সরকারও, যারা এ ক্ষেত্রে সোচ্চার কণ্ঠ তারাও কাজের ক্ষেত্রে নিজেদের কথার বাস্তবায়নে ব্যর্থ। ব্যক্তি ও পুরো সমাজকে আঘাত করার কৌশল হিসেবে সংঘাতে যৌন সহিংসতার পথ বেছে নেওয়া অব্যাহত রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটের বিরুদ্ধে নারীর অধিকার, মর্যাদা ও নেতৃত্বকে সুরক্ষা দিতে ও এর পক্ষে প্রচারণার ক্ষেত্রে আমাদের প্রচেষ্টা দ্বিগুণ করতে হবে। দশকের পর দশক ধরে যে বিষয়টি বিজয়ী হয়ে এসেছে, আমাদের তাকে আর জয়ের সুযোগ দেওয়া উচিত নয় এবং এ ক্ষেত্রে সার্বিক, দ্রুত ও আমুল পরিবর্তনের ওপর আমাদের অবশ্যই জোর দিতে হবে।

এ বছর আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য হলো ‘সমান চিন্তা, বুদ্ধিদীপ্ত নির্মাণ, পরিবর্তনের জন্য উদ্ভাবন’, যা সেই সব পরিকাঠামো, ব্যবস্থা ও অবকাঠামোকে চিহ্নিত করে, যেগুলো গড়ে উঠেছে পুরুষ নির্ধারিত সংস্কৃতির আলোকেই। আমাদের এই বিশ্বটাকে পুনঃকল্পনা ও পুনর্নির্মাণের জন্য আমাদের একটি উদ্ভাবনী পথ খুঁজে বের করা প্রয়োজন, যা সবার জন্যই সমান কার্যকর হবে। নগরায়ন নকশা, পরিবহন ও জনপ্রশাসনের মতো ক্ষেত্রে নারী সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা এসব খাতে নারীর প্রবেশের সুযোগ বৃদ্ধি, হয়রানি ও সহিংসতা প্রতিহত এবং সবার জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাতে পারেন।

এই বিষয়টি ডিজিটাল ভবিষ্যতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, যা আমাদের ওপরই নির্ভরশীল। উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিতে নির্মাতার বৈশিষ্ট্যই প্রতিফলিত হয়। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল, গণিত ও নকশা প্রণয়ন খাতে নারীর অপ্রতুল প্রতিনিধিত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি সবার জন্যই উদ্বেগের কারণ হওয়া উচিত।

গত মাসে ইথিওপিয়ায় আমি ‘আফ্রিকান গার্লস ক্যান কোড’ নামের একটি উদ্যোগের সঙ্গে কিছু সময় কাটিয়েছি। এই উদ্যোগ ডিজিটাল জগতে লিঙ্গ পার্থক্য ঘোচাতে এবং প্রযুক্তি দুনিয়ায় আগামীর নেতৃত্বকে প্রশিক্ষণ দিতে কাজ করে। ওই মেয়েরা নিজেদের প্রকল্পে যে শক্তি আর উদ্যম প্রদর্শন করেছে, তাতে আমি অভিভূত। এ ধরনের কর্মসূচি কেবল দক্ষ জনশক্তিই গড়ে তোলে না, এগুলো মেয়েদের লক্ষ্য ও স্বপ্নকে সীমিত করা ধরাবাধা ছককেও চ্যালেঞ্জ জানায়।

এবারের আন্তর্জাতিক নারী দিবসে, আসুন আমরা নিশ্চিত করি যে নারী ও কিশোরীরাও আমাদের সবার জীবনের ওপর প্রভাব ফেলা নীতি, পরিষেবা ও অবকাঠামোর আকার দিতে পারে। এবং আসুন যে নারী ও কিশোরীরা সবার জন্য সুন্দর পৃথিবী গড়তে বাধা ভাঙছে, তাদের সমর্থন জানাই।

Comments