ফিচার বাংলাদেশ ক্যাম্পাস সর্বশেষ

কক্সবাজারের শরনার্থী ক্যাম্প থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রোহিঙ্গা তরুণী

কক্সবাজারের শরনার্থী ক্যাম্প থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রোহিঙ্গা তরুণী

বাংলাদেশে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়া এক রোহিঙ্গা তরুণী উচ্চশিক্ষার জন্য চট্টগ্রামের এশিয়া ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছেন। এটা সবদিক দিয়েই ব্যতিক্রমী ঘটনা। ১৮ বছর বয়সী ওই তরুণীর নাম ফরমিন আকতার। তাকে নিয়েই ‘A Rohingya girl’s journey from refugee camps to college’শিরোনামে বুধবার দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যম রয়টার্স। বাংলাদেশ জার্নালের পাঠকদের জন্য এটি অনুবাদ করে দেয়া হলো।

প্রথমবার ফারমিন আকতারের সঙ্গে দেখা হয়, তখন সে হেলেন কিলারকে নিয়ে আলাপ করতে চেয়েছিল। ফরমিনার বয়স ১৮। তার সঙ্গে আমার আলাপ কক্সবাজারের এক রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এক বাঁশের ছাউনি দেয়া ঘরে। সে বসেছিল একটি প্লাস্টিকের টুলে।

ওই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্থানরত লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর মতো সে-ও মিয়ানমার সেনাদের হত্যা, ধর্ষণ আর নির্যাতন থেকে বাঁচতে পরিবারের সঙ্গে রাখাইন থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।

২০১৭ সালের আগস্টের শেষ দিকে রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর জাতিগত নিধন অভিযানে গণহত্যা, ধর্ষণ ও বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগের পর সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। তাদের দলেরই একজন এই ফরমিন আক্তার।

ফরমিন কথা বলতে চাইছিল আমেরিকার বিখ্যাত অন্ধ,বধির ও মূক লেখক হেলেন কিলারকে নিয়ে। কেননা ওই প্রতিবন্ধী নারই যে তার প্রেরণাদাত্রী।

এছাড়া পাকিস্তানি শিক্ষা অধিকারকর্মী নোবেলজয়ী মালালা ইউসুফজায়ীকে নিয়েও তার বেশ আগ্রহ। কেননা সবচেয়ে কম বয়সী নোবেলজয়ী মালালাও তাকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করে থাকেন।

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অগ্নিসংযোগে ভস্মীভূত হয়ে যাওয়া বসতবাড়িতে ফরমিনের পাঠ্যবইও ধ্বংস হয়ে যায়। সেসব বই নিয়েও কথা বলতে চাইছিল এ রোহিঙ্গা তরুণী। ভবিষ্যতে একজন আইনজীবী হওয়ার স্বপ্ন দেখেন ফরমিন। মালালার মত নিজেও রোহিঙ্গা মেয়েদের শিক্ষা প্রসারে কাজ করতে ইচ্ছুক সে।

এই প্রতিবেদন তৈরি করার আগে আমি প্রায় বছর খানেক ধরে রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে ঘুরে বেড়িয়েছি। ফরমিনের বয়সী মেয়েদের সাক্ষাৎকার নিয়েছি, যাদের বেশিরভাগই ধর্ষণ ও নানা যৌন হয়রানির হাত থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।

সাধারণতঃ এসব বাঁশের তৈরি শিবিরগুলোতে নারী ও কিশোরীদের রান্নাবান্না, বাচ্চাদের দেখভাল বা অন্যান্য সাংসারিক কাজকর্মে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। এই শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়া পৃথিবীর সবচেয়ে নিপীড়িত এ সম্প্রদায়ের বেশিরভাগই নিরক্ষর। এদের মধ্যে যেসব গুটিকয়েক লোকজন মিয়ানমারে লেখাপড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন, তাদের জ্ঞান অর্জনের পরিধিও তেমন বেশি নয়। তারা কেবল বার্মিজ ভাষায় কথা বলতে পারে, ব্যস এটুকুই।

এর আগে এইসব শিবিরে ফরমিনের মতো কাউকে আমার চোখে পড়েনি। কথা বলার সময় তার লাজুক হাসি, কখনও কখনও মুখ লুকিয়ে ফেলা, সবই আকর্ষণীয়।সে কথা বলছিল বই আর শিক্ষা নিয়ে। দেশহীন এ তরুণী শিক্ষার মূল্যবোধ নিয়ে ছিল দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। মিয়ানমারে নির্মম বর্বরতার সাক্ষী এই মেয়েটি কিন্তু এখনও আর্দশ হারায়নি।

রয়টার্সের মিয়ানমার ব্যুরোপ্রধান অ্যান্টোনিও স্লোডকাউসকি ও আমি তাৎক্ষণিকভাবে তার সঙ্গে কথা বলতে উৎসুক হয়ে উঠি। সে আমাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাহিনী বলেছে। পরে ফরমিনের সঙ্গে কথোপকথনের ভিত্তিতে তৈরি এই বিশেষ প্রতিবেদনটি গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত হয়। গত কয়েক মাসে আমি তার কাছ থেকে উল্লেখ করার মতো অনেক কিছু জেনেছি।

দরিদ্র রাখাইন রাজ্যের এক দুর্গম গ্রামের মেয়ে সে। যে গুটিকয়েক রোহিঙ্গা নিজেদের চেষ্টায় ইংরেজি শিখতে পেরেছে, তাদের একজন ফরমিন।

সে বাংলাদেশে আশ্রয়শিবিরের ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের শিকার নারীদের কাউন্সিলিংয়ের দায়িত্বে আছে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে সক্ষম বলে যে ২৫ রোহিঙ্গা কিশোরীকে শনাক্ত করা হয়েছে, সেই তালিকায় ফরমিনও আছে।

তার পরবর্তী গল্প মেলাতে বেশ কষ্ট করতে হয়েছিল। এর পর তার চাচাকে খুঁজে বের করলাম, যিনি শরণার্থী হিসেবে নরওয়ে পালিয়ে গেছেন। কক্সবাজারের বিস্তৃত রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে আমি তার কয়েকজন শিক্ষককে খুঁজে পেলাম। তাদের মধ্যে এমন একজন ছিলেন, যার কাছ থেকে ফরমিন প্রথম মালালার কথা শুনেছেন।

২০১৭ সালে ফরমিনের স্কুলে মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসা ১৫০ কিশোরী সম্পর্কে আমি জানতে পারলাম। সে বছর পাস করা চারজনের মধ্যে সেও একজন। স্কুলের প্রায় সবাই তার সম্পর্কে জানতেন। তার ইংরেজি ও গণিতের দক্ষতা সবাইকে মুগ্ধ করেছিল।

পরিবার ও বন্ধুরা ফরমিনের উজ্জ্বল সম্ভাবনা ও দৃঢ়প্রতিশ্রুতি নিয়ে বলার পাশাপাশি তার বড় বোন নূরজাহানের গল্পও করছিলেন। দুই বোন শৈশবে একসঙ্গে কলেজে যাবে বলে প্রতিজ্ঞা করেছিল। কিন্তু নূরজাহানকে তার পরিবার বিয়ে দিয়ে দেয়। নূরজাহানের সঙ্গে কথা বলার সময় তার স্বামী পাশেই ছিলেন। আর তাঁবুর ফাঁক গলিয়ে তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন আমাদের আলাপ শুনছিলেন।

একসঙ্গে কলেজে যেতে ফরমিন ও তাদের প্রতিজ্ঞার গল্প শুনছিলাম তখন। এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতেই নূরজাহান কেঁদে ফেলেন। তার দুচোখ পানিতে ভরে যায়। আর আশ্রয়শিবিরের তাঁবুরও ওপর তখন টুপটাপ বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছিল। ওড়নার এক প্রান্ত দিয়ে চোখ মুছে ফের কথা শুরু করেন নূরজাহান।

কথা বলার মাস কয়েক পার হতেই দেখি অন্যরকম এক আত্মবিশ্বাস নিয়ে বেড়ে উঠছে ফরমিন। ইতিমধ্যে সে কারাতে ও গিটার বাজাতে শিখেছে। এক ইন্দো-মার্কিন শিক্ষকের কাছ থেকে তার এসব শেখা।

কিন্তু তার কিছু অভ্যাস আগের মতোই রয়ে গেছে। গ্রন্থাগারে সে আমাকে তার পছন্দের বইগুলো দেখিয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে শার্লট ব্রন্টির জেন ইয়ার। শৈশবে শিক্ষার গুরুত্ব নিয়েও কথা বলে ফরমিন।

রয়টার্সে ফরমিনের পরিচয় প্রকাশের পরই লিংকসহ মালালা ইউসুফজাই টুইটারে সেটি শেয়ার দেন। এতে রোমাঞ্চিত বোধ করে ফরমিন। মিয়ানমারে স্কুলে বসে শিক্ষকের মুখে মালালার গল্প শোনার কথা স্মরণ করে সে। ভাবতেই পারছে না, মালালা এখন তার গল্প পড়ছেন, যা তার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল।

ফরমিন বার্তা পাঠিয়ে আমাকে জানায়, এ ঘটনায় সে যে কতটা আনন্দিত, তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছে না। এ নিয়ে তার অভিব্যক্তি, ‘‌আপনি জানেন, তাকে (মালালা) আমি ভালোবাসি।’

ফরমিন জানায়, সেমিস্টার পরীক্ষার ফাঁকে শরণার্থী শিবিরে দাতব্য সংস্থাগুলোর জন্য সে কিছু অনুবাদের কাজ করবে। এর আগে এ ধরনের কাজ করে এক বছরে সে যে কয়টা পয়সা জমিয়েছিল, তা নূরজাহানের বিয়েতে খরচ হয়ে গেছে।

গত বছরের ২৪ আগস্ট ফরমান চট্টগ্রামের এশিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। এই সাক্ষাৎকারটি নেয়া শুরু হয়েছিল ফরমিনার তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরু হওয়ার আগে। দীর্ঘ কয়েক ধাপে সাক্ষাৎকারটি শেষ করেন রয়টার্স প্রতিনিধি। তিনি দেখেন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের পর আত্মবিশ্বাসী ফরমিনের বদলে যাওয়াও। ঠোঁটে লিপস্টিক মেখে জিন্স ও স্কার্ফ পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে যায় সে। ক্যাম্পাসে যখন সে আমার দিকে এগোচ্ছিল, বন্ধুরা তখন তার দিকে হাত নাড়ছিল। তাদের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে আসা শরণার্থীও রয়েছে; যাদের কাছ থেকে ফরমিন ফারসি শিখেছে।

 

মূল প্রতিবেদক: জেবা সিদ্দিকী

অনুবাদ: মাহমুদা আকতার

Comments