ফিচার বাংলাদেশ ক্যাম্পাস সর্বশেষ

ঢাবির সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও তাদের রাজনৈতিক হয়ে উঠার গল্প

ঢাবির সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও তাদের রাজনৈতিক হয়ে উঠার গল্প

বর্তমান সময়ে রাজনীতি তার নাম হারিয়ে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে একথা যে কেউ নিঃসন্দেহে মেনে নিবেন। এ জন্যই এখন রাজনৈতিক মনোনয়নের সময় দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে এসে আমরা হাজার হাজার অতিরিক্ত উৎসাহী লোকের সমাগম দেখতে পাই। তারা রাজনীতিকে জীবন গঠনের একমাত্র পথ হিসেবে বেছে নেয়। আর যারা সেইসব রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকতে পারে না তারাও আশেপাশে পেরিফেরীতে মিশে যাওয়ার আপ্রান চেষ্টা করে যায়। আজ ডাকসু নির্বাচনকে সামনে রেখে এতদিন যাবত নিরপেক্ষ ভাব ধরা সংগঠনগুলো হঠাত করে একটা দলীয় লেবাস পরিধান করার জন্য মাঠে নেমেছে।

ডাকসু বন্ধ থাকা অবস্থায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ টিএসসিতে যে কয়েকটি সংগঠন এই সময়ে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক মান ধরে রাখছে বলে বিশ্বাস করে এসেছি হঠাৎ করে সবকিছু এভাবে ভেঙে পড়বে ভেবে থাকলেও এটাকে স্রেফ ভাবনার পর্যায়েই রাখতে চেয়েছি। কিন্তু ক্ষমতায় মিশে যাওয়ার এই সুবর্ণ সুযোগ কেউই হাতছাড়া করতে চায় না এমনকি এটা যদি তাদের সাংগঠনিক চর্চার বিরুদ্ধে যায় তবুও।

কথা হচ্ছিলো সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন নিয়ে। আলাপের খাতিরে বুঝা যাওয়ার পরেও আমি কিছুটা ব্যাখ্যা দাড় করাতে চাই। সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন তার বিশেষত্ব ধরে রাখে এভাবেই যে এটি কোন রাজনৈতিক সংগঠন না। একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক সংগঠনগুলো তাদের নিজ নিজ আদর্শ ও উদ্যেশ্য অনুযায়ী পরিচালিত হয়। নির্বাচনী সময় সে তার নীতিগত জায়গায় জোটবদ্ধ হয়ে আন্দোলনে যায় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। আর সেই রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের আদর্শই নেতাকর্মীদের মধ্যে বাস্তবায়িত করতে চায়। কিন্তু সামাজিক অথবা সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে এটি একটু ভিন্ন।

আমি আলোচনা আগানোর খাতিরেই এখানে একটি ঐতিহ্যবাহী সংগঠনের নাম বলবো। যারা মূলত মুক্তচর্চা নিয়ে কাজ করতে চায়। আমি উদাহরণ স্বরুপ বলছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিতর্ক সংসদ নিয়ে। সেখানে বলতে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে সক্রিয় কিন্তু নিষিদ্ধ না এমন যে কোন সংগঠনের কর্মী অথবা নেতা অথবা একেবারেই সাধারণ জায়গায় থেকে সে সেই সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়ে তাদের কাজ পরিচালনা করে। তবুও তাদের ব্যক্তিগত চিন্তার জায়গায় ঐ সংগঠনের দায়িত্বে থাকা যেকোন ব্যক্তি তার দলীয় পরিচয়ে যুক্ত হতে পারে।

 

মানে সে ব্যক্তিগতভাবে ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রলীগ বা ছাত্রদল যেকোন সংগঠনের সাথে আন্দোলন করতে পারে এমনকি নেতাও হতে পারে। তাতে কিছুই যায় আসে না। কিন্তু দলীয় ট্যাগ কাজে লাগিয়ে বা সেই সংগঠনের ব্যানার নিয়ে কোন একক সংগঠনের চিন্তা বা আদর্শকে এমনকি দাবীকেও সে সমর্থন দেওয়ার নৈতিক কোন ভিত্তি পাবে না।

এই সময়ে এসে যখন বিতর্ক সংসদ হঠাত একটি দলকে সমর্থন করে তখন বাকী যারা সেই সংগঠনের সাথে একমত না তাদের অস্থিত্বের প্রশ্ন উঠে আসে। প্রশ্ন আসতে পারে তাদের এক্সিকিউটিভ কমিটি যেই সিদ্ধান্ত নিতে চায় তাহলে তারা সেটা পারে কী না। উত্তর তারাও সেটা পারে না, কারণ যেকোন একটা সংগঠনে এমন একটা দলের সংখ্যা বেশী হতেই পারে। যেভাবে দখলদারিত্বের চর্চা হয় তা আমাদের কারোরই অজানা না। কিন্তু সেখানে যদি একজনও অন্য সংগঠনের দলভুক্ত থাকে তবে তার নৈতিক জায়গায় চাপ প্রয়োগ করা হয় এবং সেই সংগঠন তার নৈতিক ভিত্তি হারায়। টিএসসি ভিত্তিক সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন গুলোতে ছাত্র ইউনিয়নসহ সকল রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মী কাজ করছে। তার মানে কী তারাও সেই একটি দলের প্যানেলে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে হবে, নাকি তাদের সেই সংগঠন ছেড়ে দিতে হবে এই প্রশ্নের উত্তর তাদের কাছে নেই।

টিএসসির যেই ২২ সংগঠন আজকে নিজেদের নেতা বলে দাবী করছেন, তাদের মাথায় কি এটাও আসে না যে তারা আদৌতে নেতা না, সংগঠক মাত্র। প্রেসিডেন্ট আর সেক্রেটারি হলেই কি নেতা উপমা লাগাতে হয়! এভাবে চলতে থাকলে আগামী কয়েক বছরেই সংগঠনগুলো যদি তাদের বর্তমান অবস্থা বজায় রাখতে চায় তাহলে অচিরেই এই সংগঠন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে পরিত্যক্ত বলে সামনে আসবে। তারা সামাজিক সাংস্কৃতিক চর্চার বাইরে শুধুমাত্র কোন একটি ক্ষমতার জায়গায় এবং বিলীন না হয়ে যাওয়ার যে চেষ্টা করছে অচিরেই তারা এই সিদ্ধান্তের এবং দলীয় লেবাসের বাইরে বের হয়ে আসবে বলে প্রত্যাশা করছি।

লেখক: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা

Comments