ফিচার বাংলাদেশ সর্বশেষ শিক্ষা

শিক্ষকদের এখনই সজাগ হতে হবে

শিক্ষকদের এখনই সজাগ হতে হবে

দেশের শিক্ষার মান সর্বনিম্নে অথচ সরকারি প্রশাসন, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিক, শিক্ষক ও অভিভাবক কারোরই সামান্যতম টনক নড়েছে না। শংকিত হওয়ার বিষয়ে গদ ২৭ তারিখ বিশ্ব ব্যাংক বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার নিম্নমানের সুস্পষ্ট প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ সন্তোষজনক হলেও মানের দিক দিয়ে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় প্রাথমিক স্তরে ১১ বছর পর্যন্ত শিশুকে যা শেখানো হচ্ছে, তা মূলত অন্যান্য দেশের শিশুরা সাড়ে ছয় বছরের মধ্যেই শিখে ফেলছে। ফলে বাংলাদেশের প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক স্তর শেষ করলেও তারা সাড়ে চার বছর পিছিয়ে থাকছে।

প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর বলেছেন, প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের যা শেখানো হচ্ছে তা পর্যাপ্ত নয়। শিক্ষাব্যবস্থা অনুন্নত মান হওয়ার কারণে ১১ বছরের মধ্যে সাড়ে চার বছরই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের। ৫ম শ্রেণিতে ১১ বছর পর্যন্ত যে শিক্ষা দেয়া হচ্ছে তা মূলত সাড়ে ছয় বছরে পাওয়ার কথা।

বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা স্তরে ৫ম শ্রেণির ১০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে নিজ পাঠ্যপুস্তকের অংক দেয়া হলেও তাদের মধ্যে প্রতি চারজনে একজন অংক কষতে পারে। তাতে দেখা যায় ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থীই পাঠ্যপুস্তকের অংক বোঝে না বা শিক্ষকরা বোঝাতে পারছেন না। অপরদিকে ৩য় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাত্র ৩৫ শতাংশ শিক্ষার্থী বাংলা পড়তে পারে, বাকি ৬৫ শতাংশ শিক্ষার্থীই বাংলা বই দেখে পড়তে পারে না।

রবাট জে সাম বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের শিক্ষাখাতে সরকারি ব্যয় অনেক কম। বাংলাদেশের শিক্ষাখাতে মালয়েশিয়ার চেয়ে জিডিপির অর্ধেক অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। বাজেটে শিক্ষা খাতে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে তা দিয়ে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন।

তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় সব শিক্ষার্থী স্কুলে যাচ্ছে। বিদ্যালয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে মেয়েদের সংখ্যা বেশি। কিন্তু শ্রেণিকক্ষে যা শেখানো হচ্ছে তা অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক পিছিয়ে থাকছে। ফলে শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা বেশি খারাপ করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়নে সরকার, প্রশাসন, শিক্ষক, শিক্ষার্থী অভিভাবক ও শিক্ষানুরাগীদের এখনই সজাগ ও সচেতন হতে হবে। ১১ বছরের একটি শিশু পঞ্চম শ্রেণি সমাপনীর পর যখন মানের দিক থেকে সাড়ে চার বছর পিছিয়ে থাকে, তাহলে লেখাপড়া শেষে এই নিম্নমানের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে কী অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে না? আগামী দিনে এরাই কি দেশের বোঝা হয়ে দাঁড়াবে না? মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব আর সংবিধান প্রতিপালনের দায়িত্ব সরকারের।

বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রান্তিক অসচ্ছল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সন্তানরাই অধিক পরিমাণে মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ করার পর সরকারি কর্মকর্তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপতির এক অধ্যাদেশে দেশের প্রতিটি জেলা উপজেলায় দুটি সরকারি স্কুল বালক/ বালিকা ও দুটি কলেজ সরকারি করার জন্য বলা হয়েছিল। সেই অনুযায়ী এখনো কিছু সংখ্যক জেলা, উপজেলায় একটি দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্কুল কলেজ জাতীয়করণ করা হচ্ছে। একটি উপজেলায় ৩/৪ লক্ষ মানুষের বাস, মাত্র দুটি সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রান্তিক অসচ্ছল মানুষের সন্তানরা লেখাপড়ার সুযোগ পায় না। এই দুটি সরকারি প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের উদ্দ্যোগ ছিল মূলত সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের সন্তানদের শিক্ষার সুবিধার্থে। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশে শিক্ষার অধিকারের ক্ষেত্রে এই বৈষম্য কখনোই কাম্য হতে পারে না।

আপনি কী আপনার সন্তানদের মানসম্মত শিক্ষা প্রদানের সঠিক দায়িত্ব পালন করছেন? তাই আসুন শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকগণ দেশের শিক্ষার মানোন্নয়নের স্বার্থে বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হই। আগামী প্রজন্মকে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ উপহার দিতে হলে, তাদের গুণগত মানের শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে এখনই। গুণগত মানের শিক্ষকরাই পারেন মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে। তাই শিক্ষকতা পেশাকে মর্যাদাশীল ও আকর্ষণীয় করার মাধ্যমে মেধাবীদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করে শিক্ষার মানোন্নয়ন নিশ্চিত করুন।

সভাপতি বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী ফোরামে

Comments