ফিচার বাংলাদেশ সর্বশেষ মতামত আইন-আদালত

শিবিরকর্মী থেকে দুর্ধর্ষ খুনি

শিবিরকর্মী থেকে দুর্ধর্ষ খুনি

যশোরের নওয়াপাড়া ইউনিয়ন ছাত্রশিবিরের সক্রিয় কর্মী ছিল আসাদুল্লাহ। পরে ২০১৫ সালে সে যোগ দেয় নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমে, যার বর্তমান নাম আনসার আল ইসলাম। ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি তাকে যশোর থেকে রাজধানীর উত্তর বাড্ডার একটি বাসায় এনে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। একপর্যায়ে সে নিজেই হয়ে ওঠে সংগঠনটির সামরিক শাখার প্রশিক্ষক। 

২০১৬ সালে সে উত্তর বাড্ডার সাতারকুলে পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে অস্ত্র ছিনিয়ে নেয়। একই বছরে রাজধানীর কলাবাগানে চাঞ্চল্যকর জুলহাজ মান্নান ও মাহবুব তনয়কে হত্যায় সরাসরি অংশ নেয় দুর্ধর্ষ এ খুনি। সেদিন গাজীপুরের টঙ্গী থেকে সে বাসে ঢাকায় এসে যোগ দিয়েছিল হত্যা মিশনে।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তাকে টঙ্গী থেকে গ্রেফতারের পর বুধবার ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানায় পুলিশ।

রাজধানীর কলাবাগানের লেকসার্কাস এলাকার বাড়িতে ২০১৬ সালের ২৫ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডির কর্মকর্তা জুলহাজ ও তার বন্ধু তনয়কে কুপিয়ে হত্যা করে জঙ্গিরা। এ ঘটনায় জুলহাজের বড় ভাই মিনহাজ মান্নান কলাবাগান থানায় মামলা করেন।

সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম জানান, চাঞ্চল্যকর জুলহাজ-তনয় হত্যার দায় স্বীকার করে আনসার আল ইসলাম। প্রথমে মামলাটি তদন্ত করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পরে তদন্তের দায়িত্ব পায় সিটিটিসি। তদন্তে রহস্য উদ্ঘাটন হতে থাকে। বিভিন্ন পর্যায়ে এ হত্যাকাণ্ডে ১৩ জন সম্পৃক্ত ছিল বলে জানা যায়। তারা সবাই আনসার আল ইসলামের সদস্য। ঘটনার পর সিসিটিভি ফুটেজ দেখে পাঁচজনকে শনাক্ত করা হয়। তবে দীর্ঘ তদন্ত ও গ্রেফতারকৃতদের কাছে পাওয়া তথ্যে নিশ্চিত হওয়া যায়, ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল মোট সাতজন। তাদের পাঁচজন 'কিলার গ্রুপ' (ঘাতক দল) ও দু'জন ইন্টেলিজেন্স গ্রুপের (গোয়েন্দা দল) সদস্য।

কিলার গ্রুপের পাঁচ সদস্য ঘটনার দিন কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মী পরিচয়ে পার্সেল দেওয়ার কথা বলে বাসার ভেতরে ঢোকে। এর মধ্যে আসাদুল্লাহসহ দু'জন গেটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা দারোয়ানকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আহত করে। ইন্টেলিজেন্স গ্রুপের দু'জন বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। 

এখন পর্যন্ত এ হত্যায় জড়িত চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা হলো- কিলার গ্রুপের আসাদুল্লাহ ও আরাফাত এবং ইন্টেলিজেন্স গ্রুপের জায়েদ ওরফে জুবায়ের ও সায়মন।

জুলহাজ ও তনয়ের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে সায়মন ও জায়েদ। আরাফাত সরাসরি দু'জনকে হত্যায় অংশ নেয়। তারা তিনজনই আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে।

প্রাথমিক জিজ্ঞসাবাদে জানা যায়, আসাদুল্লাহ অনেকগুলো সাংগঠনিক নামে পরিচিত। সেগুলো হলো- ফকরুল ওরফে ফয়সাল ওরফে জাকির ওরফে সাদিক। সে আনসার আল ইসলামের সামরিক শাখার দাওরা প্রশিক্ষক হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করত। সে ঢাকার বাড্ডা, আশকোনা ও গাজীপুরের বিভিন্ন আস্তানায়-মারকাজে বাসা ভাড়া নেওয়ার পদ্ধতি, নিরাপত্তার বিষয়, ডে-অ্যাম্বুশ (দিনে গোপনে ওঁৎ পাতা), সম্মানজনক মৃত্যু, চাপাতি চালানো, পিস্তল চালানো, টার্গেট ব্যক্তিকে হত্যায় এলাকায় রেকি করা এবং হত্যার সময় ও স্থান নির্ধারণের পদ্ধতি সম্পর্কে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। আসাদুল্লাহকে আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বুধবার তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।

ডিএমপি সূত্র জানায়, আসাদুল্লাহর গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার মদনপুর এলাকায়। তবে সে গাজীপুরের টঙ্গীর মরকুন কবরস্থান গেট এলাকায় থাকত। তার বাবা এমদাদুল হক চুয়াডাঙ্গার মাধবপুর ইসলামিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন। তিনি স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর রুকন ছিলেন। আসাদুল্লাহ ২০০১ সালে মদনপুর দাখিল মাদ্রাসা থেকে পাস করে যশোর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে মেকানিক্যাল বিষয়ে পড়া শুরু করে।

বিজ্ঞানমনস্ক লেখক অভিজিৎ রায় হত্যার প্রধান সন্দেহভাজন শরীফুল ওরফে মুকুল রানার মাধ্যমে ২০১৫ সালের শেষদিকে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমে যোগ দেয় আসাদুল্লাহ। সংগঠনে তার নাম দেওয়া হয় ফয়সাল। পরের বছর জুনে খিলগাঁওয়ে 'বন্দুকযুদ্ধে' মুকুল রানা নিহত হয়। জুলহাজ-তনয় হত্যা মামলার চার্জশিট শিগগির দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ নেই ৪ বছর: আসাদুল্লাহর বাবা এমদাদুল হক সমকালকে জানান, ২০১৪ সালের শেষের দিকে ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয়ে ছেলের সঙ্গে তার মতবিরোধ হয়। এরপর আসাদুল্লাহ বাড়ি ছেলে চলে যায়। তার সঙ্গে পরিবারের কোনো যোগাযোগ নেই। 

গত ৯ জানুয়ারি আসাদুল্লাহর ছোট ভাই আবুজর হোসাইন ঢাকায় আসেন। ওই রাতেই দুই ভাইকে টঙ্গীর বাসা থেকে আটক করে পুলিশ। আসাদুল্লাহকে মঙ্গলবার গ্রেফতার দেখানো হলেও আবুজরের খোঁজ মেলেনি।

Comments